আইভরিকোস্ট পেরেছিল যুদ্ধ থামাতে, ভারত কি পারবে ক্রিকেটকে বাঁচাতে
//আহমেদ সোহেল বাপ্পী//
‘মোস্তাফিজুর রহমান’ এই ঘটনার মূল চরিত্র নন। তিনি মাত্র একটি উপলক্ষ। পুরো ঘটনার কেন্দ্রে আছে রাজনীতি—এবং সেই রাজনীতির ভেতরে লুকিয়ে থাকা উগ্রতা ও বৈষম্য।
কিছু উগ্রবাদী রাজনৈতিক শক্তির চাপেই ৯ কোটি ২০ লাখ রুপি দামের আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দিয়েছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)। এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায়, নিরাপত্তা শঙ্কার কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলকে (আইসিসি) জানিয়েছে—বাংলাদেশ দল ভারতে অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নাও নিতে পারে। এই টানাপোড়েন কেবল ক্রিকেট ঘিরে নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক ও নৈতিক সংকটের প্রতিচ্ছবি।
এখানে প্রশ্নটা আরও গভীর। ক্রীড়া ও সংস্কৃতি কি রাজনীতির হাতিয়ার হওয়ার জন্য? নাকি এগুলো মানুষের মধ্যে শান্তি, সহাবস্থান ও সংলাপ গড়ে তোলার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম?
ইতিহাস আমাদের ভিন্ন কথাই বলে। যুগ যুগ ধরে ক্রীড়া ও সংস্কৃতি জাতিগত সংঘাত, রাজনৈতিক বিবাদ এমনকি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ থামাতে ভূমিকা রেখেছে।
এর সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ ২০০৫ সালের আইভরিকোস্ট।
পাঁচ বছর ধরে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত একটি দেশ—চারদিকে ক্ষুধা, হত্যা, নির্যাতন আর রক্ত। সেই সময় সুদানকে হারিয়ে আইভরিকোস্ট প্রথমবারের মতো ফুটবল বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। দেশজুড়ে আনন্দের জোয়ার। খেলোয়াড়রা ড্রেসিংরুমে উল্লাসে মেতে ওঠে। ঠিক তখনই অধিনায়ক দিদিয়ের দ্রগবা সবাইকে থামান। ডাকা হয় মিডিয়া। পুরো দেশ সরাসরি সম্প্রচারে তাকিয়ে থাকে।
মাইক্রোফোন হাতে, মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে দ্রগবা বিবাদমান দুই পক্ষের কাছে অনুরোধ করেন—এই রক্তপাত বন্ধ করতে, দেশকে নতুন করে গড়তে। এটিকে রূপকথা ভাবার সুযোগ নেই। বাস্তবেই সেই গৃহযুদ্ধ থেমে গিয়েছিল। আজও আইভরিকোস্টে দ্রগবা শুধু একজন খেলোয়াড় নন; তিনি একটি জাতির বিবেক, প্রায় এক ডেমিগড।
এখানেই হিসাবটা ভয়ংকরভাবে বেমানান হয়ে যায়।
২০২৩–২৪ সালের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী ভারতের শিক্ষার হার ৮০.১৯ শতাংশ। অন্যদিকে আফ্রিকার দরিদ্র দেশ আইভরিকোস্টের শিক্ষার হার ২০২১ সালে ছিল ৫০.০২ শতাংশ। ভারত বিশ্বজুড়ে কর্পোরেট জগতে দীর্ঘদিন ধরেই আধিপত্য ধরে রেখেছে—উচ্চ শিক্ষা, দক্ষতা ও সামাজিক পরিমিতবোধের কারণে। আরও মনে রাখা দরকার, পৃথিবীর প্রায় ৪০ শতাংশ ধনী ক্রেতার বসবাস এই ভারতে।
তবু বাস্তবতা হলো, সাম্প্রতিক সময়ে ভারত তার প্রায় কোনো প্রতিবেশীর সাথেই সুসম্পর্ক বজায় রাখতে পারছে না। চারপাশের দেশগুলো একে একে বিরক্ত, ক্ষুব্ধ ও শঙ্কিত। প্রশ্ন জাগে—কেন ভারতীয় নীতিনির্ধারকেরা ক্রীড়া ও সংস্কৃতির মতো শান্তির শক্তিশালী মাধ্যমকে ধর্ম ও পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির হাতিয়ারে পরিণত করলেন?
যে ভারত বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রবাদের উত্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে, সেই ভারত নিজ দেশের ক্রীড়া ও সংস্কৃতির ভেতরেই উগ্রতার জায়গা তৈরি করছে কেন? এই দ্বিচারিতার ব্যাখ্যা কী? একটা ব্যাখ্যা হয়ত প্রকৃতি দিচ্ছে এই ভাবে, ধর্ম নিরপেক্ষতার দাবিদার ভারতে ধর্ম কতখানি নিরপেক্ষ তা মোস্তাফিজ নামের একটা দলিলে পুরা বিশ্ব দেখলো।
এটি শুধু মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে অবিচার নয়। এটি খেলাধুলার আত্মার সঙ্গে রসিকতা । এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ সহাবস্থানের ওপর সরাসরি মশকরা।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতের জন্য সবচেয়ে জরুরি শিক্ষা আসতে পারে কোনো ধনী রাষ্ট্র বা পরাশক্তির কাছ থেকে নয়, বরং একটি দরিদ্র আফ্রিকান দেশ—আইভরিকোস্টের কাছ থেকে। যেখানে কম শিক্ষার হার, কম সম্পদ থাকা সত্ত্বেও ক্রীড়াকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে তুলে ধরে তারা রক্তপাত থামাতে পেরেছিল।
শান্তির পক্ষে ভারতের নিজের কণ্ঠ
প্রতিবেশীর সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ভারতের জন্য নতুন কোনো ভাবনা নয়; এটি ভারতের রাষ্ট্রচিন্তার ঐতিহাসিক ভিত্তি।
মহাত্মা গান্ধী (১৮৬৯–১৯৪৮) ১৯৪৭ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় দিল্লি ও নোয়াখালিতে অহিংসার মাধ্যমে দেখিয়েছিলেন—ঘৃণা রাষ্ট্র গড়ে না, ধ্বংস করে।
জওহরলাল নেহরু (১৮৮৯–১৯৬৪) ১৯৫৪ সালে চীনের সঙ্গে পঞ্চশীল চুক্তির মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির মূল স্তম্ভে পরিণত করেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১) ১৯১৭–১৮ সালে তাঁর জাতীয়তাবাদ বিষয়ক লেখায় সতর্ক করেছিলেন—মানবতাকে ছাপিয়ে যাওয়া জাতীয়তাবাদ আত্মবিনাশ ডেকে আনে।
অটল বিহারী বাজপেয়ী (১৯২৪–২০১৮) ১৯৯৯ সালে লাহোর সফরে বলেছিলেন—বন্ধু বদলানো যায়, কিন্তু প্রতিবেশী বদলানো যায় না।
ড. এ পি জে আবদুল কালাম (১৯৩১–২০১৫) রাষ্ট্রপতি থাকাকালে (২০০২–২০০৭) বারবার বলেছেন—শান্তি ছাড়া উন্নয়ন অসম্ভব।
স্বামী বিবেকানন্দ (১৮৬৩–১৯০২) ১৮৯৩ সালের শিকাগো ধর্মসভায় ঘোষণা করেছিলেন—সহনশীলতাই সভ্যতার প্রকৃত শক্তি।
এই কণ্ঠগুলো ভারতের বাইরের নয়; এরা ভারতের নৈতিক ইতিহাস।
আজ প্রশ্ন একটাই—এই ভারতের নামেই কেন ক্রীড়া ও সংস্কৃতি বিভাজনের রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হচ্ছে?
আইভরিকোস্ট যদি ২০০৫ সালে খেলাধুলার শক্তিতে গৃহযুদ্ধ থামাতে পারে, তবে ভারত কেন প্রতিবেশীর সঙ্গে শান্তির পথে হাঁটতে পারবে না?
এই বাস্তবতায় ভারতের গুণীজন, বুদ্ধিজীবী ও নৈতিক কণ্ঠস্বরেরা কী ব্যাখ্যা দেবেন?
আর ভারত কি আদৌ আইভরিকোস্টের কাছ থেকে এই মানবিক শিক্ষাটা নিতে প্রস্তুত ?
বিশ্লেষক:-
মানবাধিকার কর্মী
পর্যবেক্ষক ।
বিশ্লেষক
সীমান্ত হীন গণতন্ত্র
কমেন্ট বক্স